Tarek Rahman

গত ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে তারেক রহমানের জীবন, আইনি সংকট ও রাজনৈতিক নির্বাসনের কঠিন অধ্যায়

লন্ডন–ঢাকা: বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং সময় কেটেছে যুক্তরাজ্যে। প্রায় ১৭ বছর তিনি কাটিয়েছেন মামলা, শারীরিক অসুস্থতা এবং কার্যত রাজনৈতিক নির্বাসনের মধ্যে। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর দেশে ফেরার পথ বারবার রুদ্ধ হয়েছে আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে।

২০০৮ সালের পর যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তারেক রহমানের প্রধান সমস্যা ছিল বাংলাদেশের আদালতে চলমান একের পর এক মামলার রায়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হয়। একই সঙ্গে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও অর্থপাচার সংক্রান্ত মামলায় বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ঘোষিত হয়। এসব মামলার কারণে দেশে ফেরার অর্থ ছিল তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবরণ।

আইনি সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয় পাসপোর্ট জটিলতা। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং তা নবায়নে সরকারি অনীহার কারণে তিনি দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক আশ্রয়ের ওপর নির্ভরশীল অবস্থায় ছিলেন। এতে তাঁর আন্তর্জাতিক চলাচল, রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং ব্যক্তিগত জীবন মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

শারীরিক দিক থেকেও এই সময়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন। ২০০৭–০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রিমান্ডে থাকাকালীন তিনি গুরুতর মেরুদণ্ডের আঘাতে আক্রান্ত হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনে যেতে হয়। দীর্ঘ সময় হুইলচেয়ার ব্যবহার এবং নিয়মিত ফিজিওথেরাপির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যা তাঁর দ্রুত দেশে ফেরার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে।

রাজনৈতিকভাবে বিদেশে অবস্থানকাল ছিল আরও চ্যালেঞ্জিং। ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় দেশে তাঁর ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, বিদেশে ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি তাঁর জীবনকে আরও সংকুচিত করে তোলে।

এই দীর্ঘ সময়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাঁর জীবনে গভীর চাপ তৈরি করে। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ উচ্চ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে থাকা একাধিক মামলায় সাজা স্থগিত করেন বা পুনর্বিচারের সুযোগ দেন, যা আইনি স্বস্তি এনে দেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের শুরুতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যে কাটানো এই ১৭ বছর তারেক রহমানের জন্য শুধু নির্বাসনের সময় নয়, বরং মামলা, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও নেতৃত্ব ধরে রাখার এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।