লিখেছেন: বিশেষ প্রতিবেদক, জয় বাংলা নিউজ
সভ্যতার মুখোশ যখন খুলে যায়
সাভারের সেই পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারের স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালগুলো আজ বোবা সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক পৈশাচিকতার। যে ভবনের পাশ দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেছে, যার কয়েক শ গজের মধ্যেই ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী (আর্মি ও পুলিশ), সেই ভবনের ভেতরেই রচিত হয়েছে নরক। ‘সাইকো সম্রাট’ নামধারী এক যুবক সেখানে কেবল মানুষ হত্যাই করেনি, বরং আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতাকে এক চরম উপহাসের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সাভারের সম্রাট: একটি ‘কেস স্টাডি’
সম্রাটকে যখন প্রথম দেখা যায়, তখন তাকে সমাজ ‘ভবঘুরে’ বা ‘পাগল’ বলে অবজ্ঞা করেছিল। এটিই একজন সিরিয়াল কিলারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র— Invisibility বা অদৃশ্য থাকা। সে সমাজের এমন এক স্তরে নিজেকে স্থাপন করেছিল যেখানে কেউ তাকে সন্দেহ করার প্রয়োজন বোধ করেনি।
মার্জিত ভাষার আড়ালে পৈশাচিকতা: গ্রেপ্তারের দুদিন আগের ভাইরাল ভিডিওটি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, ভাষার চাতুর্য দিয়ে অপরাধীরা কীভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। ভিডিওতে সম্রাট যখন একজন কিশোরী পাগলীকে ‘আশ্রয়’ দেওয়ার কথা বলছিল এবং নারীর প্রতি ‘সম্মান’ দেখাচ্ছিল, তখন তার অবচেতন মন আসলে শিকারকে প্রলুব্ধ করার খেলায় মত্ত ছিল। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Mask of Sanity’। এই ধরণের অপরাধীরা জানে সমাজ কোন কথাগুলো শুনতে পছন্দ করে। তারা অত্যন্ত মার্জিতভাবে কথা বলে যাতে তাদের আসল চেহারা কেউ ধরতে না পারে।
কেন জন্ম নেয় সাইকো কিলার? (Psychological Breakdown)
একজন সাইকো কিলারের মনস্তাত্ত্বিক গঠনের চারটি প্রধান স্তম্ভ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:
ক) শৈশবের অন্ধকার গলি (The Triad of Evil):
অধিকাংশ সিরিয়াল কিলারের শৈশব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা চরম অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার। ম্যাকডোনাল্ড ট্রায়াড (MacDonald Triad) অনুযায়ী তিনটি লক্ষণ ছোটবেলায় দেখা দিলে সেই শিশুটি ভবিষ্যতে সিরিয়াল কিলার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে: ১. পশু-পাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা। ২. দীর্ঘ সময় ধরে বিছানায় প্রস্রাব করা (মানসিক অস্থিরতার লক্ষণ)। ৩. আগুন নিয়ে খেলা বা অগ্নিসংযোগের প্রবণতা। সম্রাটের ক্ষেত্রেও হয়তো এমন কোনো লুকানো ইতিহাস রয়েছে যা তাকে সহমর্মিতাহীন (Lack of Empathy) এক দানবে পরিণত করেছে।
খ) ফ্যান্টাসি ও শিকারের নেশা:
সাধারণ খুনিরা কোনো লাভের আশায় খুন করে (টাকা বা প্রতিশোধ)। কিন্তু সম্রাটের মতো সাইকো কিলাররা খুন করে ‘Psychological Gratification’ বা মানসিক তৃপ্তির জন্য। তাদের কাছে প্রতিটি খুন একটি অর্জনের মতো। লাশ কাঁধে করে নিয়ে যাওয়ার সময় সিসিটিভিতে তার যে সাবলীল ভঙ্গি দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে সে এই কাজটিতে ভয় নয়, বরং এক ধরণের ‘পাওয়ার’ বা ক্ষমতা উপভোগ করছিল।
গ) ডার্ক টেট্রাড (Dark Tetrad) তত্ত্ব:
মনোবিজ্ঞানে চারটি নেতিবাচক গুণকে একসাথে ‘ডার্ক টেট্রাড’ বলা হয়, যা সম্রাটের চরিত্রে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান: ১. নার্সিসিজম:নিজেকে অন্য সবার চেয়ে বুদ্ধিমান মনে করা। ২. ম্যাকিয়াভেলিয়ানিজম: মানুষকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার ও ম্যানিপুলেট করা। ৩. সাইকোপ্যাথি: অন্যের কষ্টের প্রতি সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন থাকা। ৪. স্যাডিজম: কাউকে কষ্ট পেতে দেখে বা পুড়িয়ে মারতে দেখে আনন্দ পাওয়া।
রসু খাঁ থেকে সম্রাট: ১৭ বছরের বিচারহীনতার দায়
২০০৯ সালে চাঁদপুরের রসু খাঁ যখন ধরা পড়ে, তখন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো একজন ‘সিরিয়াল কিলার’ শব্দের সাথে পরিচিত হয়। ১০১টি খুনের লক্ষ্য নিয়ে নামা রসু খাঁ ১১ জন নারীকে হত্যা করেছিল।
একটি করুণ বাস্তবতা: রসু খাঁ ধরা পড়ার পর আজ ১৭ বছর পার হয়ে গেছে। ২০০৯ সালে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল, সে আজ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ও কারাগার মিলে রসু খাঁর ফাঁসি কার্যকর করতে পারেনি। এই দীর্ঘসূত্রিতা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি সম্রাটের মতো উদীয়মান অপরাধীদের জন্য একটি ‘গ্রিন সিগন্যাল’। যখন একজন অপরাধী দেখে যে ১১ জন মানুষকে কুপিয়ে মারার পরও রাষ্ট্র তাকে ১৭ বছর ধরে তিন বেলা খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখে, তখন তার মনের ভেতর থেকে আইনের ভয় উঠে যায়।
পরিত্যক্ত স্থান ও সামাজিক নজরদারি (Social Failure)
আর্মি ক্যাম্প ও পুলিশ স্টেশনের নাকের ডগায় একটি পরিত্যক্ত ভবন মাসের পর মাস বধ্যভূমি হয়ে থাকা আমাদের নজরদারির অভাবকেই নির্দেশ করে।
- পরিত্যক্ত জায়গার ঝুঁকি: পরিত্যক্ত ভবন অপরাধীদের জন্য ‘সেফ জোন’ হিসেবে কাজ করে। সম্রাট এই সুযোগটিই নিয়েছে।
- ভবঘুরে ছদ্মবেশ: আমাদের সমাজ পাগল বা ভবঘুরেদের এড়িয়ে চলে। সম্রাট জানত যে সে যদি নোংরা পোশাকে রাস্তার ধারে বসে থাকে, তবে ভদ্রলোকেরা তার ধারেকাছেও আসবে না। এই ঘৃণাকে সে তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।
সমাজের প্রতি সচেতন বার্তা
সাভারের সম্রাট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, যমদূত সবসময় বীভৎস চেহারা নিয়ে আসে না। সে আসতে পারে আপনার পাশের বাড়ির ‘ভদ্র’ প্রতিবেশী হিসেবে, অথবা রাস্তার ধারের ‘সহজ-সরল’ ভবঘুরে হিসেবে।
আমাদের করণীয়: ১. পরিত্যক্ত ভবনের তালিকা: নিজ এলাকার পরিত্যক্ত ভবনগুলোর বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে চাপ দিন। ২. মানসিক স্বাস্থ্যের পর্যবেক্ষণ: পরিবারের কারো মধ্যে চরম নিষ্ঠুরতা বা একাকিত্বের লক্ষণ দেখলে তাকে অবহেলা করবেন না। ৩. বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া: রসু খাঁ বা সম্রাটের মতো অপরাধীদের বিচার যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তবে সমাজ থেকে ‘সাইকো সম্রাট’দের কোনোদিন নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
সম্রাটের ফাঁসি হয়তো হবে, কিন্তু যে মানসিকতা সম্রাটকে তৈরি করেছে, তা এখনো আমাদের চারপাশেই বিচরণ করছে। আপনার আজকের সচেতনতা এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে আপনার কণ্ঠস্বরই পারে কালকের কোনো সম্ভাব্য শিকারকে রক্ষা করতে।



